Bangladesh

রাবির হেফজোখানার নাম নিয়ে বিতর্ক, বিভ্রান্তি নাকি শুধুই ষড়যন্ত্র
Photo

সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সোবহানিয়া আলকুরআনুল কারীম হিফজখানা’ নামে একটি হেফজোখানা (পবিত্র কোরআন শিক্ষার প্রতিষ্ঠান) চালু করা হয়েছে। একটি মহল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম আবদুস সোবহানের নামের সঙ্গে ‘মিল রেখে’ ওই হিফজখানার নামকরণ করা হয়েছে বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তারা নিজেদের অপকর্ম-দূর্নীতি-লুটপাট ঢাকতে নানা রকম ষড়যন্ত্র করে-মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্মানহানী এবং মহান আল্লাহর পবিত্র বাণী  কোরআন শিক্ষার মত বিষয় নিয়ে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি তৈরি করার মাধ্যমে আবারও নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে।

প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ সোবহানাতায়ালার একটি গুন বাচক নাম ‘সোবহান’। আরবী ‘সোবহান’ শব্দের অর্থ পবিত্র। আরবী শব্দের শেষে ‘ইয়া’ এবং ‘গোল তা’ বা ‘হায়ে হাওয়াজ’ ব্যবহার করে শব্দটিকে কোন কিছুর সাথে সমন্ধযুক্ত করা হয়। যেমনঃ সোবহান থেকে সোবহানিয়া।

মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা বনী-ইসরাঈল এর ১ নং আয়াতে বলেন,

”سُبۡحٰنَ الَّذِیۡۤ اَسۡرٰی بِعَبۡدِہٖ لَیۡلًا مِّنَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ اِلَی الۡمَسۡجِدِ الۡاَقۡصَا الَّذِیۡ بٰرَکۡنَا حَوۡلَہٗ لِنُرِیَہٗ مِنۡ اٰیٰتِنَا ؕ اِنَّہٗ ہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ”

(অর্থঃ পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল মাসজিদুল হারাম থেকে আল মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। আল-বায়ান)

উক্ত আয়াতে ব্যবহৃত سبحان  (সোবহান) শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে-

(ক) ইমাম সুয়ুতী (রহঃ) এর সুবিখ্যাত কোরআনের শাব্দিক বিশ্লেষণ গ্রন্থ আল ইতক্বানে বলা হয়েছে سبحان (সোবহান) শব্দটি মাসদার। পবিত্রতা বর্ণনা করা অর্থে ব্যবহার হয়। মানসূর হওয়া এবং মুফরাদের দিকে ইযাফত হওয়া এর জন্য লাজেম, তা ইসমে জমীর। (জাদীদ লোগাতুল কুরআন, আল কাউসার প্রকাশনী, ঢাকা-২০১৪, পৃঃ৫০২)

(খ) سبحان  শব্দটি মূলধাতু। এর অর্থ, যাবতীয় ত্রুটি ও দোষ থেকে পবিত্র ও মুক্ত। আয়াতে এর ব্যবহারিক অর্থ হচ্ছে, আমি তাঁকে পবিত্র ও মুক্ত ঘোষণা করছি। (ফাতহুল কাদীর)

(গ) سُبْحَانَ হল, سَبَّحَ يُسْبِّحُ এর মাসদার (ক্রিয়া বিশেষ্য)। অর্থ হল, أُنَزِّهُ اللهَ تَنْزِيْهًا অর্থাৎ, আমি প্রত্যেক দোষ-ত্রুটি থেকে আল্লাহর পবিত্র ও মুক্ত হওয়ার কথা ঘোষণা করছি। সাধারণতঃ এর ব্যবহার তখনই করা হয়, যখন অতীব গুরুতত্ত্বপূর্ণ কোন ঘটনার উল্লেখ হয়। উদ্দেশ্য এই হয় যে, বাহ্যিক উপায়-উপকরণের দিক দিয়ে মানুষের কাছে এ ঘটনা যতই অসম্ভব হোক না কেন, আল্লাহর নিকট তা কোন কঠিন ব্যাপার নয়। কেননা, তিনি উপকরণসমূহের মুখাপেক্ষী নন। তিনি তো كُنْ শব্দ দিয়ে নিমিষে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। উপায়-উপকরণের প্রয়োজন তো মানুষের। মহান আল্লাহ এই সব প্রতিবন্ধকতা ও দুর্বলতা থেকে পাক ও পবিত্র। (তাফসীরে আহসানুল বায়ান)

আমরা জানি যে, প্রত্যেকটি ইবাদতের শুরু হয় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের তাসবিহ বা স্বপ্রশংস মহত্ব ঘোষনার মাধ্যমে। যেমন প্রত্যেক নামাজের শুরুতেই তাকবিরের পর তাসবিহ পাঠ করা হয়; সোবহানাকাল্লাহুমা…। নামাজের রুকু এবং সেজদাতে পাঠ করা হয় সোবহানা রাব্বী ইয়াল আজমী… আ’লা…।

আরও পড়ুনঃ রাবির হেফজোখানা নিয়ে বিভ্রান্তির অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ভিসি বিরোধী ষড়যন্ত্র

তাসবিহ এর অধিকাংশই ‘সোবহান’ শব্দ দিয়ে শুরু হয়েছে-

১) سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيمِ উচ্চারণ : সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আজিম’। (বুখারি, মুসলিম)

২) سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ عَدَدَ خَلْقِهِ وَرِضَا نَفْسِهِ وَزِنَةَ عَرْشِهِ وَمِدَادَ كَلِمَاتِهِ উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি আদাদা খালকিহি ওয়া রিজা নাফসিহি ওয়া জিনাতা আরশিহি ওয়া মিদাদা কালিমাতিহি। (সহিহ মুসলিম শরিফ, ৭০৮৮)

৩)  سُبْحَانَ ذِي الْجَبَرُوتِ، وَالْمَلَكُوتِ، وَالْكِبْرِيَاءِ، وَالْعَظَمَةِ  উচ্চারণ: সুবহা-নাযিল জাবারূতি, ওয়াল মালাকুতি, ওয়াল কিবরিয়া-ই ওয়াল ‘আযামাতি। (মুসনাদে আহমদ, তিরমিজি)

৪) سُبوحٌ، قُدُّوسٌ، رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ উচ্চারণ: সুব্বূহুন কুদ্দূসুন রব্বুল মালা-ইকাতি ওয়াররূহ। (মুসলিম, আবু দাউদ)

৫) سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي উচ্চারণ: সুবহা-নাকাল্লা-হুম্মা রব্বানা ওয়া বিহামদিকা আল্লা-হুম্মাগফির লী। (মুসনাদে আহমদ, তিরমিজি, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)

৬)  سُبْحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى উচ্চারণ: সুবহা-না রব্বিয়াল আ‘লা। (মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, নাসাঈ)

আরও পড়ুনঃ রাবির সাবেক প্রশাসনের (২০১৩-২০১৭) অনিয়ম ও দুর্নীতি; গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ

আল-কোরআনে এবং অসংখ্য হাদীসে আল্লাহ তায়ালার ‘সোবহান’ নাম এবং আল্লাহ তায়ালার এই নামের গুরুত্ব সম্পর্কে বহূবার উল্লেখ করা হয়েছে-

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা ক্বাফ- এর নং ৩৯ আয়াতে বলেন,

‘‘فَاصۡبِرۡ عَلٰی مَا یَقُوۡلُوۡنَ وَ سَبِّحۡ بِحَمۡدِ رَبِّکَ قَبۡلَ طُلُوۡعِ الشَّمۡسِ وَ قَبۡلَ الۡغُرُوۡبِ’’

(অর্থঃ অতএব এরা যা বলে, তাতে তুমি ধৈর্যধারণ কর এবং সূর্য উদয়ের পূর্বে ও অস্তমিত হওয়ার পূর্বে তুমি তোমার রবের প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ কর। আল-বায়ান)

সহীহ বুখারী শরীফের সর্বশেষ হাদিসে বলা হয়েছে,

‘’حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ فُضَيْلٍ، حَدَّثَنَا عُمَارَةُ بْنُ الْقَعْقَاعِ، عَنْ أَبِي زُرْعَةَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ، ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ، حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمَنِ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ ‏”‏‏.

(অর্থঃ কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুটি কলেমা এমন যা জিহবাতে অতি হালকা অথচ মীযানে ভারী আর রাহমানের নিকট খুব পছন্দনীয়; তা হলঃ সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আযীম। হাদীস নং ৬২২৫)

আরও পড়ুনঃ রাবির মিজান-সজল প্রশাসনের সাথে জামায়াত -বিএনপির ঘনিষ্ঠতা; গণমাধ্যমের ভাষ্য

সুতরাং স্পষ্টতই বুঝা যায় ‘সোবহান’ আল্লাহ সোবহানাতায়ালার একটি গুন বাচক নাম। ‘সোবহানিয়া আলকুরআনুল কারীম হিফজখানা’ নামের বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘পবিত্র আলকুরআনুল কারীম হিফজখানা’। যা মহান আল্লাহর নামেই, কোন ব্যক্তির নামে নয়।

মানুষ যা কিছুই করুক না কেন, মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের মনের সকল প্রকাশ্য এবং গোপন বিষয় সম্পর্কে নিশ্চয় অবগত। আল্লাহ তায়ালার কাছে লুকানোর কিছু নেই। মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহান স্যারের নেক নিয়াত নিশ্চয় আল্লাহ সোবহানাতায়ালা কবুল করবেন। উপাচার্য স্যার কে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কবরস্থান জামে মসজিদ নির্মাণ এবং মহান আল্লাহ সোবহানাতায়ালার নামে হেফজোখানা প্রতিষ্ঠার জন্য সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।

Search

Follow us

Read our latest news on any of these social networks!


Get latest news delivered daily!

We will send you breaking news right to your inbox

About Author

Like Us On Facebook

Calendar