করোনা, স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থা ও বন্যা প্রসঙ্গ। - Eakattor 24 Hours

Miscellineous

করোনা, স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থা ও বন্যা প্রসঙ্গ।
Photo

বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে এসময় কঠিন দানব করোনার সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই চলছে। এ দানব ভাইরাসকে মোকাবেলার  লড়াইয়ে আজ মানব জাতি ঐক্যবদ্ধ। মহামারির শুরু থেকেই প্রতিষেধক টিকা ও চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন গবেষকগণ। এই ঘোর তমাচ্ছন্ন আঁধারে আশার আলো দেখা দিয়েছে যে আমাদের দেশে প্রতিষেধক টিকা আসবে চলতি বছরে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে। আমরা এই দানবকে পরাভূত করার প্রতীক্ষায়। গত ২৬ জুলাই ২০২০ পর্যন্ত চার মাসে দেশে সতের কোটি জনসংখ্যার মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে দুই লাখ তেইশ হাজার চারশত তেপান্ন জন তার মধ্যে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনসহ ঢাকা জেলাতেই আক্রান্ত আট চল্লিশ হাজার তিনশত বায়ান্ন জন এবং সারা দেশে মৃত্যু ২ হাজার নয়শত আঠাশ জন । এর মধ্যে জুন ও জুলাই মাসের প্রথমদিকে আক্রান্তের চূড়া ছিল শীর্ষে। দেশে ১৮ মার্চ করোনায় প্রথম মৃত্যু হয়। এখন প্রতিদিনে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ জনের মৃত্যু হচ্ছে। জনসংখ্যার তুলনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু সংখ্যা কম। কিন্তু যে কোন সময় সংক্রমণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। জনসাধারণের মধ্যে ইতিমধ্যে সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে উদাসীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রথম দিকে এই ভাইরাস সংক্রণ নিয়ে জনমনে আতঙ্ক, সচেতনতা ও সতর্কতা যেমন ছিল ধীরে ধীরে সেসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা যেন শিথিল হয়ে পড়েছে। জীবিকার তাগিদে বা অন্যান্য প্রয়োজনে মানুষ অসহনশীল হয়ে বেড়িয়ে পড়ছে। কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে কোরবানির পশু কেনা, মানুষের গ্রামে ফেরাতে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। আক্রমণ ও মৃত্যু হঠাৎ জ্যামিতিক হারে বাড়তে পারে। যদিও সরকার কোরবানি পশু পরিবহণ ও হাটের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় স্থগিত করেছেন।

এই মহা দুর্যোগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে অনৈক্যের নানা খবর আমরা সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি। মহামারি প্রতিরোধের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনায় বিশৃঙ্খলা মোটেও কাম্য নয়। এই মূহুর্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বয়হীনতা অনাকাক্সিক্ষত। প্রথম আলোর ১৮ জুলাই প্রতিবেদনে দেখা যায় – করোনাকালে আরও অভিযোগ এসেছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) এর মান নিয়ে, এন ৯৫ মাস্ক, ভেন্টিলেটর, গগলস নিয়েও দুর্নীতের ব্যাপক অভিযোগ ছিল। বিশ্বব্যাংক ও এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এর আর্থিক সহায়তা প্রকল্পেও কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এবং তদন্তে সত্যতা মিলেছে। সমকালের ১৮ জুলাই এর প্রতিবেদনে দেখা যায় – করোনা প্রতিরোধে জোনভিত্তিক লকডাউন নিয়ে সঠিক পরিকল্পনাও বিঘ্নিত হয়েছে। রেড, ইয়েলো ও গ্রিন – এই তিন জোনে ভাগকরে কার্যক্রম গ্রহণের কথা জুলাই মাসের প্রথমেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কার্যত জোনভিত্তিক লকডাউন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এছাড়া করোনা মোকাবেলায় বিভিন্ন সময় কীট সংকট, করোনা সনাক্তকরণ পরীক্ষা কেন্দ্রের স্বল্পতা, রিপোর্ট প্রাপ্তির দীর্ঘসূিত্রতা, ফলাফলে ভিন্নতা, করোনা পরীক্ষার ফী নির্ধারণ নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে নানা সমালোচনা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এসব কারণে গত ২১ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নানা অনিয়মের কারণে ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত হলে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন। ২২ জুলাই তা কার্যকর হয়েছে। আরও কিছু শুদ্ধি অভিযান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কভিড -১৯ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সেবায় মান বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম খুঁজে দেখতে ৯ সদস্যের একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে। আশা করি সামনে এই সমস্যা কাটিয়ে এই মহামারি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারবে এবং একসাথে কাজ করবে।

করোনা মহামারিতেই বেসরকারি কিছু হাসপাতালে যেমন জোবেদা খাতুন হেলথ গ্রুপ (জেকেজি) করোনার নমুনা শনাক্ত ছাড়াই পজেটিভ, নেগেটিভ রিপোর্ট দিত। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরী এবং চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী এসংক্রান্ত নানাবিধ জালিয়াতির কারণে গ্রেফতার হয়েছেন। আবার বহুরূপী প্রতারক মো. সাহেদ করিমের রিজেন্ট হাসপাতালে করোনার নমুনা সংগ্রহ না করেই প্রতিবেদন দিত। বিনিময়ে সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৮ হাজার ৬শত টাকা নেয়া হতো। পরীক্ষা ছাড়াই ২৪ ঘন্টার পরে রিপোর্ট দেয়া হতো। রিজেন্টের সাহেদ ভারতে বোরখা পড়ে পালাতে গিয়ে  ধরা পড়ায় দেশবাসী আনন্দিত হয়েছে। এছাড়া গুলশানে বেসরকারি সাহাবুদ্ধিন মেডিকেলে অনুমোদন ছাড়াই করোনা পরীক্ষায় প্রতারণা ও জালিয়াতি ধরা পড়ায় এমডিকে আটক করে র‌্যাব। এই দুর্যোগে কী ভয়ঙ্কর সব কুকীর্তি উন্মোচিত হচ্ছে যা পুরো জাতিকে বিস্মিত ও আতঙ্কিত করেছে। সরকারের কাছে জনগণের দাবী এই দুর্বৃত্তদের বিচার করে  কঠোর শাস্তি যেন প্রদান করা হয় । করোনা মহামারি মোকাবেলায় সরকার যথেষ্ট আন্তরিক ও গুরুত্বের সঙ্গে ইতিবাচক নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ৭৭টি নমুনা পরীক্ষা কেন্দ্র (১০ জুলাই পর্যন্ত) প্রতিষ্ঠা করেছে। তার মধ্যে ৪৭টি সরকারি ব্যবস্থাপনায় এবং ৩০টি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা যথাযথ নিশ্চিত করার জন্য দু’হাজার চিকিৎসক, সাড়ে ৫ হাজার নার্স ইতিমধ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও  তিন হাজার পাঁচ শত টেকনোলজিস্ট নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। এছাড়া আরও ৪ হাজার নার্স ও ২ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ অপেক্ষাধীন রয়েছে। দেশে সর্বোচ্চ রপ্তানি খাত হলো পোশাক শিল্প। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে পোশাক শিল্পে ৩১৮ কোটি ডলারের রপ্তানি ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত হয়। সংক্রমণ রোধে প্রায় একমাস পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল। অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে বিক্রয়কেন্দ্র খোলার পরপরই পুরনায় ক্রয়াদেশ দিতে শুরু করেছেন। তবে মাস্ক ও পিপিই এর মতো স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী রপ্তানি চালু ছিল। বিজিএমই এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ৪৪ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী রপ্তানি হওয়ায় রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন আশা দেখাচ্ছে।

অন্যদিকে ভারী ও প্রবল বর্ষণে আগাম বন্যায় দেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের নদী তীরবর্তী নিন্মাঞ্চলের দূর্গত মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। দেশের ৩১ জেলার মানুষ বন্যা কবলিত হয়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ২৫ জুলাই ২০২০ পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী  দেশে বন্যায় মারা গেছে ১১১ জনের মত। বন্যায় ৪০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ, ১৮ জেলায় বন্যার অবনতি হয়েছে। দেশে ২৯ নদীর মধ্যে ১৩ টিতে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। জাতিসংঘের আশাঙ্কা ১৯৮৮ সালের চেয়েও ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী হবে বন্যা পরিস্থিতি। বন্যা মোকাবেলায় সরকারের আগাম প্রস্তুতি ও নানা পদক্ষেপ থাকায় শীঘ্রই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে আশা করা যায়। বিশ্ব মহামারি কোভিড-১৯ এর প্রভাবে ক্ষুধা ও দারিদ্রতা মোকাবেলা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। লাখ লাখ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তকে চাকুরি হারাতে হয়েছে। লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিকরাও শুন্য হাতে দেশে ফিরেছে। দারিদ্রতা মোকাবেলা করাও সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

করোনাকালে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে- পর্যায়ক্রমে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার চিন্তা-পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ব বিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষার্থীদের সামর্থ ও সক্ষমতা নিয়ে এক্ষেত্রে প্রশ্ন রয়েছে। করোনায় প্রতিদিন এত আক্রান্ত, মৃত্যু আর দুর্নীতির খবরে যখন জনগণ আশাহত হয়ে পড়েছে তখনই আমাদের নতুন আশার আলো দেখিয়েছেন অনুজীব বিজ্ঞানী ডা. সেঁজুতি সাহা ও তার বাবা ঢাকা শিশু হাসপাতালের অনুজীবী বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সমীর সাহা। তাঁরা মিলে তাদের প্রতিষ্ঠিত শিশু স্বাস্থ্য গবেষণা ফাউন্ডেশন ( সিএইচ.আরএফ) এর নেতৃত্বে যৌথভাবে করোনা ভাইরাসের জিন নকশা বা জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করেন। ডা. সেঁজুতি সাহা ইতোমধ্যে ডব্লিওএইচও-এর এর পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

বিশ্বে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় সাত মাস হতে চলল। গত ২৬ জুলাই ২০২০ পর্যন্ত সংক্রমিত হয়েছেন এক কোটি বাষট্রি লাখ তেত্রিশ হাজার একশত পঞ্চাশ জন এবং মৃত্যু হয়েছে  ছয় লাখ উনপঞ্চাশ হাজার একশত ত্রিশ জনের । কিন্তু সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর প্রতিষেধক বা টিকা এখনো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তবে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত টিকাটি পরীক্ষামূলক প্রয়োগে সুফল আসছে। আগামী অক্টোবর নাগাদ ব্যবহারের উপযোগী হওয়ার আশা আছে। অক্সফোর্ডের সম্ভাব্য টিকাটির নাম সিএইচএডিওএক্সওয়ানএনসিওভি-১৯। চীনের উদ্ভাবিত টিকা বাংলাদেশে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়েছে। রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা আগস্টের মধ্যেই প্রথম টিকা আনতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। আশা করি আমরা শীঘ্রই করোনা দানবকে পরাজিত করতে সক্ষম হবো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবসময় সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ব্যক্ত করেছেন। গ্রেফতারকৃত মহা প্রতারকদের আইনের আওতায় এনে দ্রুতততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে জনগণ আশা করছে। চিকিৎসা সেবা মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে একটি ও অন্যতম। এটি নিয়ে প্রতারণা ও অনিয়ম জঘন্যতম অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। এই অপরাধীদের শাস্তি অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক হওয়া উচিত।স্বাস্থ্যখাতের নানা দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্ত করে আইনের আওতায় এনে জড়িতদের বহুবিধ শাস্তি নিশ্চিত হওয়া উচিত। তাহলে এই মহামারিতে দেশের ভাবমূর্তি ফিরে দাঁড়াবে ও দেশের জনগণের স্বাস্থ্য সেবায় নানা ভোগান্তি দূর হবে এবং স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষা পাবে।

Search

Follow us

Read our latest news on any of these social networks!


Get latest news delivered daily!

We will send you breaking news right to your inbox

About Author

Like Us On Facebook

Calendar