Politics

৭১'ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি নিষিদ্ধের বক্তব্যে বিশিষ্টজনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া
Photo

নিউজ ডেস্কঃ জাতীয় সংসদে গত ২৪ জানুয়ারি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতি কদর্য ভাষায় বিষোদ্গার ও নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ। তার এই বক্তব্যের পর দেশজুড়ে বইছে নিন্দার ঝড়। তার এই ধরনের বক্তব্যের নেপথ্যে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। কি সেই উদ্দেশ্য? এ নিয়ে দেশের ৪ জন বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে কথা বলেছেন মুহাম্মদ রুহুল আমিন।

শাহরিয়ার কবির একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেছেন, কাজী ফিরোজ রশীদের বক্তব্যে এটা পরিস্কার হয়েছে, তারা মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক ও যুদ্ধাপরাধীদের তোষণের রাজনীতি করে। সেই রাজনীতি থেকে একেবারেই ফিরে আসেনি। আওয়ামী লীগকে বিভ্রান্ত করে, বোকা বানিয়ে, ভোটারদের প্রতারিত করে তারা সংসদে ঢুকেছে। এই কথা ফিরোজ রশীদ যদি নির্বাচনের আগে বলতেন, তাহলে আমরা দেখতাম আওয়ামী লীগ কিভাবে এদের সঙ্গে জোট করে, মনোনয়ন দেয়। দেশের মানুষ তখন ফিরোজ রশীদকে একটি ভোটও দিত না। আমরা দেখব, আগামীতে কাজী ফিরোজ রশীদ কিভাবে নির্বাচন করে? কেননা, আমাদের ক্যাম্পেইন হচ্ছে জাতীয় সংসদ জামায়াত ও রাজাকারমুক্ত করতে হবে। সেটা একাত্তরের রাজাকার হোক আর এখনকার নব্য রাজাকার হোক। এই সংসদে আমরা এদেরকে ঢুকতে দেব না। একাত্তরের ঘাতক দালাল ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের আমরা জাতীয় সংসদে দেখতে চাই না। এটা পরিষ্কার বক্তব্য। গতকাল সোমবার ভোরের কাগজকে তিনি এসব কথা বলেন।

শাহরিয়ার কবির বলেন, কাজী ফিরোজ রশীদের মতো এত তুচ্ছ লোকের পেছনে আমার সময় নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা এগুলোকে কোনো গুরুত্বই দেই না। কেননা মানুষ জানে, এরা কি? জাতীয় পার্টির কি কোনো চরিত্র আছে? পতিতাবৃত্তির রাজনীতির চ‚ড়ান্ত উদাহরণ হচ্ছে জাতীয় পার্টি। জাতীয় সংসদের মতো পবিত্র জায়গায় কাজী ফিরোজ রশীদ কুরুচিপূর্ণ ও অসংসদীয় বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা তার বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, আমরা যখন গণহত্যার স্বীকৃতির জন্য গণস্বাক্ষর অভিযান শুরু করেছি। তখন মৌলবাদীরা আমার বিরুদ্ধে ফেসবুকে অশ্লীল-কদর্য ভাষায় লেখালেখি করছে। তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এসব স্বাক্ষর সারাবিশ্বে ও জাতিসংঘে পাঠাব যে গণহত্যার জন্য কে দায়ী? এই গণহত্যাকারীদের প্রথম দফায় পুনর্বাসিত করেছে জেনারেল জিয়া। দ্বিতীয় দফায় পুনর্বাসিত করেছে জেনারেল এরশাদ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানকে হত্যা করে এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করলেন। এরশাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলটাও আদালতের রায় অনুযায়ী অবৈধ ছিল। তিনি অবৈধ ক্ষমতা দখলকে বৈধতা দেয়ার জন্য তথাকথিত মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সঙ্গে হাত মেলান। একাত্তরের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানান। ক্ষমতায় থেকে শত শত মুক্তিযোদ্ধা, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র-জনতাকে হত্যা করেন। এগুলোর কোনোটাই দেশ ও জাতি ভুলেনি। সেই ঘাতকের দল বলছে- নির্মূল মানে হত্যা করা।

তিনি আরো বলেন, কাজী ফিরোজ রশীদ কোনো অভিধানে পেয়েছেন যে নির্মূল মানে হত্যা করা? নির্মূল মানে হচ্ছে মূলোৎপাটন করা। আমরা মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতার মূল উপড়ে ফেলতে চাই। এই লড়াই আমরা চালিয়ে যাবই। ফিরোজ রশীদের বক্তব্যে পরিষ্কার, জাতীয় পার্টি ছদ্মবেশে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। কিন্তু আসলে মোটেই তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নয়। তারা এখনো সেই একাত্তরের ঘাতক-দালালদের পক্ষে, যাদের নিয়ে তারা দীর্ঘ ৯ বছর ঘর করেছিল।

মুনতাসীর মামুন।
হঠাৎ করে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ জাতীয় সংসদে এ ধরনের উক্তি কেন করলেন, তা জানি না। জাতীয় সংসদে কেউ কিছু বললে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না। সুতরাং আমরা মনে করি যে সংসদে ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার জন্য এ ধরনের বক্তব্য না দেয়াই ভালো। গতকাল সোমবার একান্ত সাক্ষাৎকারে ভোরের কাগজকে এ কথা বলেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন।

তিনি বলেন, ফিরোজ রশীদ কী করেছেন, তার অবদান কী… মোটামুটি সবাই জানে। আর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সাধারণ মানুষের জন্য কী করেছেন, সেটি প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সব কিছুই অবগত। তিনি যে পার্টির প্রতিনিধিত্ব করেন, সেই পার্টি সবসময় একটি স্বৈরাচারী পার্টি হিসেবে পরিচিত। তাদের নেতার (জেনারেল এরশাদ) হাতে রক্তের দাগ ছিল- এটা সবাই জানে ও বলে। তারা তাদের সহযোগিতা করেছে। আমরা কখনোই জাতীয় পার্টির নীতি মেনে নেইনি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের সখ্য স্থাপনা-সেটাও মেনে নেইনি।

মুনতাসীর মামুন বলেন, ফিরোজ রশীদের মতো মানুষজন আমাদের একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠনের পর থেকেই সমালোচনা করেছে। ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ করেছে। তাতে কিছুই আসে-যায়নি। রাস্তার অনেকেই হাউকাউ করে। কিন্তু ক্যারাভ্যান এগিয়ে চলে। ফিরোজ রশীদরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে নানা কথা বলতে পারেন, সংসদে দাঁড়িয়েও বলতে পারেন। তাতে কারো কিছু যায় আসে না। এসব করে তাদের ভোটের সংখ্যা বাড়বে না বরং কমবে।

তিনি আরো বলেন, বিএনপির চিৎকার করা ছাড়া এখন দেশে কোনো ইস্যু নেই। ফিরোজ রশীদও এ ধরনের কথা বলে কিছুটা জনসম্মুখে আসতে চান। ফিরোজ রশীদদের কথা আমরা পাত্তা দেই না। শেখ হাসিনা কী বললেন সেটাতে আমাদের আসে-যায়।

নিজের ইতিহাস জ্ঞানশূন্যতারই প্রমাণ
বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টরস কমান্ডারস ফোরাম- মুক্তিযুদ্ধ ৭১ এর মহাসচিব, সাংবাদিক ও লেখক হারুন হাবীব বলেছেন, আমি মনে করি জাতীয় সংসদের মতো পবিত্র স্থানে দাঁড়িয়ে সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির বিরুদ্ধে যে বিষোদ্গার করেছেন, তা তার ব্যক্তিগত মতামত হলেও আমার বিবেচনায় এই মন্তব্যগুলো তার নিজের ইতিহাস জ্ঞানশূন্যতাকেই পরিস্ফ‚টিত করে। কারণ ১৯৯০-৯১ সালে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির নাম নিয়ে যে সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করেছিল, তা ইতিহাসের অনেক দায়বদ্ধতা পূরণ করেছে। আমি মনে করি, কাজী ফিরোজ রশীদ ইতিহাসের সেই ঘটনাপ্রবাহে তার পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে হয়তো ভুলে গেছেন।

আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, এ ধরনের বক্তব্য কখনোই কোনো রাজনীতিবিদের বিশেষত যারা প্রগতিশীলতার, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সহায়ক বলে নিজেদের বিবেচনা করেন, তাদের মুখে কখনোই শোভা পায় না। আমি মনে করি, একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কাজী ফিরোজ রশীদ তার এই মন্তব্যটি তুলে নেবেন এবং ভুল স্বীকার করবেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বৈপরীত্য
গোলাম কুদ্দুস।
ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি সম্পর্কে জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি কোনোভাবেই সমর্থন ও গ্রহণযোগ্য নয়। গতকাল সোমবার ভোরের কাগজকে একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস।

তিনি বলেন, ফিরোজ রশীদ এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত না থাকতে পারেন, কিন্তু তিনি যদি মনে করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজটি করে সঠিক কাজ করেছেন; তাহলে দেখতে হবে এই দাবিটি অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জানিয়ে যারা ক্ষেত্র তৈরি করেছে, সেই ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি সঠিক কাজটিই করেছে। সুতরাং এরকম একটি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার দাবি অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য।

গোলাম কুদ্দুস বলেন, কাজী ফিরোজ রশীদের মতো মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য খুবই হতাশাজনক। তার এই বক্তব্যকে আমরা কোনো অবস্থাতেই সমর্থন করি না। এমনকি কোনো সচেতন মানুষও তা সমর্থন করবে না। ফিরোজ রশীদের এই বক্তব্যকে আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বৈপরিত্য।

Search

Follow us

Read our latest news on any of these social networks!


Get latest news delivered daily!

We will send you breaking news right to your inbox

About Author

Like Us On Facebook

Calendar