Miscellineous

মিয়ানমার সামরিক অভ্যুত্থান ও রোহিঙ্গা সংকট
Photo

মিয়ানমার সামরিক  অভ্যুত্থান ও রোহিঙ্গা সংকট 

 

মিয়ানমার ভূরাজনৈতিক ভাবে দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশ। প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ তেল সমৃদ্ধ ও সৌন্দর্যের লীলাভূমি হওয়াতে এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসনের বাইরে ছিলনা। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার উপনিবেশ শাসন থেকে মুক্ত হলেও ১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে দেশটির সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। আর্ন্তজাতিক চাপ ও নানা অর্থনৈতিক বাধা  অতিক্রম করে প্রায় পঞ্চাশ বছর সামরিক শাসনের পর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ২০১১ সালে গণতান্ত্রিক নেতা অং সান সুচির নেতৃত্বে রাজনৈতিক তপের মুখে ক্ষমতা হস্তান্তরিত করে বার্মার সামরিক জান্তা। তখন থেকে মিয়ানমারের গণতান্ত্রকামী সাধারণ মানুষ ও বিশ্ববাসীর মনে একটা রাজনৈতিক শান্তির সু-বাতাস জন্মেছিল। যেখানে দেশের সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশে সকল কর্মজীবী ও প্রত্যক রাজনৈতিক দলের বাক স্বাধীনতা প্রাধান্য পাবে। গণতন্ত্র হলো সর্বোত্তম শাসন ব্যবস্থা  যেখানে দেশের সকল মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও নিজস্ব অভিমতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আর যদি গণতান্ত্র না থাকে তাহলে দেশের সকল মানুষে রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

 

২০০৮ সালে মিয়ানমারের সংবিধান সংস্কারের মধ্যে দিয়ে সেনাবাহিনী জাতীয় সংসদে ২৫ পারসেন্ট ক্ষমতা নিজেদের অধিকারে কুক্ষিগত করে। তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনীর হাতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তাই নিভু নিভু গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও দেশটির সেনাবাহিনী দাপট বিরাজমান তুঙ্গে।  সর্বশেষ নভেম্বরের ৮ তারিখে নিবার্চনে ১ হাজার ১১৭ টি জাতীয় আসনের মধ্যে অং সান সুচির গণতান্ত্রিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি ৯২০ টি আসনে নিবার্চিত হয়ে জয় লাভ করে। কিন্তু এই নিবার্চনকে সেনাবাহিনী কারচুপির অভিযোগ তুলে সংবিধান বাতিল ও সামরিক অভ্যুত্থানের হুমকি প্রদান করে। অতঃপর পহেলা ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের অধিবেশনের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রধান রেল মিন অং হ্লাইং এর নেতৃত্বে সামরিক ক্যু সংঘটিত হয়। দেশটির এস্টেট কাউন্সিলার অং সান সুচিসহ গণতান্ত্রপন্থী  সকল নেতাদের আটক করে সেনাবাহিনী। সেনাপ্রধান রেল অং হ্লাইং মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করে এক বছরের জন্য জরুরী অবস্থা জারি করেন। এই সামরিক অভ্যুত্থানকে পশ্চিমা বিশ্ব ছাড়াও জাপান ও অস্ট্রেলিয়া তীব্র প্রতিবাদ করে এবং গণতান্ত্রিক নেতা সুচিকে মুক্তি দেওয়ার জোর দাবি করে। এদিকে নাইপিদোর অকৃত্রিম বন্ধু চীন এই অভ্যুত্থানকে বিশেষ পর্যাবেক্ষণের দৃষ্টিতে দেখলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ বেইজিং এই ক্যুতে জড়িত রয়েছে। তবে মার্কিন পেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছে," নব-নির্বাচিত সরকরের নিকটে সামরিক সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তরিত করা উচিৎ এবং অং সান সুচিকে মুক্তি মধ্যে দিয়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে।" অন্যদিক  দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান শক্তিশালী দেশ ভারত সামরিক অভ্যুত্থানকে নিন্দা জানালেও বার্মাতে তাদের অর্থবিনিয়োগ রয়েছে। তাই নয়াদিল্লী কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিতে পরে। কেননা চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ নিয়ে দা-কুমড়া সম্পর্ক রয়েছ। তাই মিয়ানমারকে উভয় দেশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে । 

 

এদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া আরো জটিলতার রূপ নেবে কেননা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অস্থিরতা থাকায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন বহুমুখী সমস্যা সৃষ্টি হবে। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে সামরিক জান্তার এক রক্তক্ষয়ী  অভিযানে প্রায় এগারো লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। বাংলাদেশ সরকার মানবতার দৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদান করেন। কিন্তু দেশীয় ও আর্ন্তজাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশের জন্য বোঝা হিসাবে দাঁড়িয়েছ। মাদকদ্রব্য, চোরাকারবার বিভিন্ন সামাজিক অপরাদমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে রোহিঙ্গা। একমাত্র প্রত্যাবাসনই  রোহিঙ্গা সমস্যার মূল সমাধান। সম্প্রীত ৪২ হাজার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া চলছিল সুচি সরকরের সঙ্গে কিন্তু সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সকল প্রক্রিয়া ভেস্তে গেছে। মিয়ানমারে সামরিক সরকারের সঙ্গে বেসরকারি সরকার তথা অং সান সুচির রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি যে রাজনৈতিক অরাজকতা চলছে তাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আরো অনেক দীর্ঘ হবে। তবে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদার করতে হবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে।

 

মো, বিপ্লব আলী

কলাম লেখক ও গবেষক 

ইতিহাস বিভাগ(চতুর্থ বর্ষ)  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় 

 

Search

Follow us

Read our latest news on any of these social networks!


Get latest news delivered daily!

We will send you breaking news right to your inbox

About Author

Like Us On Facebook

Calendar